মোঃ সাকিব খান: মাগুরার শ্রীপুরে পোড়ামাটির চাকিতেই ঘুরছে ২৫ টি পরিবারের ভাগ্যের চাকা। এ পরিবারগুলোর একমাত্র আয়ের উৎস এ পোড়ামাটির চাকি। মৃৎ শিল্পে উৎপাদিত বিভিন্ন জিনিসের কদর কমে গেলেও পোড়ামাটি চাকির যথেষ্ট কদর রয়েছে। যার ফলে এ পেশায় উপজেলার সব্দালপুর ইউনিয়নের নোহাটা গ্রামের অন্তত ২৫ টি পরিবার এখনো সক্রিয় রয়েছেন। উপজেলার শ্রীপুর, সব্দালপুর ও নোহাটা গ্রামে পাল সম্প্রদায়ের বসবাস থাকলেও নোহাটা গ্রামের ২৫ টি পারিবার পোড়ামাটির চাকি তৈরি করে থাকেন। তাদের উৎপাদিত পোড়ামাটির চাকি উপজেলার চাহিদা মিটিয়ে পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন জেলা ও উপজেলাতে গিয়ে থাকে৷ গুণগত মান ভালো হওয়ায় এখানকার এ চাকির যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাত ও প্রতিকূলতার মধ্যদিয়ে ৭ পূরুষ ধরে তারা এ পেশার সাথে যুক্ত রয়েছেন। তবে এ পেশায় জীবন-যাপন দুর্বিষহ হওয়ায় অনেকেই ঝুঁকেছেন অন্য পেশায়। অভাব অনটন ও বিভিন্ন প্রতিকূলতার মাঝে ও তারা বাপ দাদার পেশ আঁকড়ে ধরে আছে। তাদের অবস্থা অনেকেরই শোচনীয়। শুরুতে তারা মাটির সকল পণ্য সামগ্রী তৈরি করলেও বর্তমানে শুধুমাত্র মাটির চাকি তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। এক সময় এ চাকি দিয়ে পানির সমস্যা নিরসনে কূপ বসানো হতো৷ সভ্যতার উৎকর্যতাই তাও হারিয়ে গেছে। তবে পরিবারের সংখ্যা বৃদ্ধি, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা সম্পর্কে মানুষের সচেতনা ও পোড়ামাটির চাকি সহজলভ্য হওয়ায় দিনেদিনে এর ব্যবহার বেড়েছে।
তবে স্বাধীনতার ৫৩ বছরে দেশের অনেক কিছুর পরিবর্তন হলেও পরিবর্তনও হয়নি এ কাজের সাথে সংশ্লিষ্টদের। প্রয়োজনীয় অর্থ ভাব ও জায়গা সংকটের কারণে দিনে দিনে এ পেশা হারিয়ে যাচ্ছে। এ পেশার সাথে জড়িত পরিবারগুলোর নেই কোন আধুনিক মেশিন ও সরঞ্জাম। মাটির চাকি তৈরিতে এঁদেল মাটি, জ্বালানি কাঠ প্রধান উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। দূরদূরান্ত থেকে এগুলো সংগ্রহ করতে গুনতে হয় প্রচুর অর্থ। বিজ্ঞানের উৎকর্ষতায়, প্রযুক্তির উন্নয়ন ও নতুন নতুন শিল্প সামগ্রীর প্রসারের ফলে, প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা এবং অনুকূল বাজারের অভাবে এখন এ পেশা অনেকটাই বিলুপ্তির পথে। কোনমতে বেঁচে থাকার জন্য দিনের ১৮ ঘণ্টা হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে এ পাশের সাথে জড়িতরা। দুঃখ-কষ্টের মাঝে দিন কাটলেও তারা স্বপ্ন দেখেন, দিনে দিনে আরও এর কদর বাড়বে, ব্যবসার পরিধি বাড়বে, আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হবে। সেদিন হয়তো তাদের পরিবারে সুখ-শান্তি ফিরে আসবে।
সোমবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মাগুরার শ্রীপুর উপজেলা শহর থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে নোহাটা গ্রাম। এ গ্রামের তিনাত পাল, উজ্জল পাল, মনিকুমার পাল, লিটন পাল, সুজিত পাল, মিনু পালসহ এ গ্রামের অন্তত ২৫ টি পরিবার পোড়ামাটির চাকি তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছে। প্রায় প্রতিটি বাড়ির উঠানে পরিবারের সকলে মিলে মাটি দিয়ে তৈরি করছে রিং বা চাকি। দু-একটি পরিবার মিলে চাকি পোঁড়ানোর জন্য তৈরি করে রেখেছেন চুল্লি বা ভাটা। ভাটায় থরে থরে শুকনো মাটির চাকি সাজিয়ে জ্বালানো হচ্ছে। সাদা মাটির চাকি দু'দিন জ্বালানোর পর পরিণত হচ্ছে লালচে বর্ণের। গ্রামে প্রবেশ করলেই মনে হচ্ছে গ্রামটাকে যেন সাজানো হয়েছে পোড়ামাটির লালচে রংয়ের মাটির চাকি দিয়ে। নারী-পুরুষ সবারই কাদা মাটির গন্ধমাখা শরীর। একসময় নিত্য ব্যবহার্য বাসনপত্র, ফুলের টপ, নান্দা, খেলনাসহ কারুকাজ করা শোপিচের বেশ কদর ছিল। বর্তমানে অ্যালুমিনিয়াম ও প্লাস্টিকের তৈরি জিনিসের কদর বেড়ে যাওয়ায় মাটির তৈরি জিনিসের আর কদর নেই। যার কারণে এ পরিবারগুলো ঝুঁকেছে মাটির তৈরি পাট বা চাকি তৈরিতে। উপজেলার চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিভিন্ন জেলা উপজেলাতে বিক্রি হচ্ছে এ সব চাকি। তাদের চাষাবাদের কোন জমিজমা না থাকায়, অন্য ব্যবসা করার মত অর্থ না থাকায় বাধ্য হয়ে তারা পোড়ামাটির চাবি তৈরি ও বিক্রির সাথে জড়িয়ে পড়েছেন। তবে স্বল্প সুদে ঋণ পেলে তারা ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন বলে জানিয়েছেন।
পলাশ পাল ও তার স্ত্রী কনিকা পাল দু'জনে বাড়ির ওঠানে মাটির চাকি তৈরি ও শুকানোর জন্য ব্যস্ত। পাশে জ্বলছে উত্তপ্ত চুলা। ভাটায় স্তরে স্তরে সাজানো মাটির চাকি। মাটির তৈরি চাকিগুলো পুৃড়ে লালচে আকার ধারন হওয়া পর্যন্ত জ্বলবে আগুন। তাদের শরীরের ঘাম টপ টপ মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে। এ সংসারে কনিকা পালের কেটেছে দীর্ঘ ১৬ টি বছর। নববধু হয়ে আসার পর থেকেই স্বামীর কাজে সহযোগিতা করে আসছেন তিনি।এ বিষয়ে পলাশ পাল জানান, আগে খুব সহজে মাটি পাওয়া যেত দামও কম ছিল। বর্তমানে মাটি সহজে পাওয়া যায় না, খরচ ও বেশি হয়। জ্বালানির দাম ও বেশি পড়ে। কাদা চাকি তৈরির উপযোগী করে তুলতে মেশিনের ব্যবহার করা হয়৷ কাজ সহজ হলেও এর জন্য আলাদা খরচ পড়ে। এছাড়া বর্তমানে স'মিল থেকে কাঠের গুড়া কিনে আনছি। মেশিনের সাহায্যে জ্বালের ব্যবস্থা করেছে। যার ফলে ধোঁয়া কম হচ্ছে। একটি চাকি তৈরিতে যে খরচ হয় তাতে তেমন একটা লাভ থাকে না। স্বামী-স্ত্রী দু'জনে মিলে কাজ করি, যা হয় তাতে নিজেদের পারিশ্রমিক থাকে। বেশি একটা লাভ হয় না।
স্ত্রী কনিকা পাল জানান, স্বামীর এ কাজে আমি সহযোগিতা করি। আমাদের মাঠে কোন জমিজমা ও চাষাবাদ নেই। এখান থেকে যে আয় হয় তা দিয়ে কোন মতে সংসার খরচ ও ছেলে-মেয়ের লেখাপড়ার খরচ চলে৷ সরকার আমাদের যদি স্বল্প সুদে ঋণ দিতো তাহলে ব্যবসার পরিধি বাড়তো। আমরা ভালো মত চলতে পারতাম। এ বিষয়ে মনিকুমার পাল বলেন, এ পরিবারগুলোর মাঠে কোন জমিজমা নেই। প্রতিটি চাকিতে সকল খরচ বাদ দিয়ে ২০ থেকে ২৫ টাকা লাভ থাকে। কোন মতে আমাদের পেট চলে। আমরা বউ ছেলে-মেয়ে সবাই মিলে কাজ করি তাই টিকে আছি। তবে এ চাকির যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। বছরের ৮ থেকে ৯ মাস এ কাজ চলে। বৃষ্টি মৌসুমে এ কাজ চলে না। তাই সে সময় প্রতিমা তৈরির কাজ করি।আমাদের পর হয়তো আমাদের মধ্যে কেউ আর এ পেশায় থাকবে না।
এ বিষয়ে লিটন পাল জানান, বর্তমানে পোড়ামাটির চাকির যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। যার কারণে ব্যবসা চালিয়ে নিতে তেমন বেগ পেতে না।বছরের মাত্র ৮ থেকে ৯ মাস চলে এ ব্যবসা। অনেক কুমোর বিভিন্ন সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে
সম্পাদক ও প্রকাশক : মনিরুজ্জামান সুমন
মোবাইল :০১৯৩০-৫৫৬৩৪৩
ই-মেইল: 𝐬𝐮𝐦𝐨𝐧𝟔𝟑𝟑𝟔@𝐠𝐦𝐚𝐢𝐥.𝐜𝐨𝐦
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয় :
৭১,পুষ্প প্লাজা (৪র্থ তলা) কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত