1. live@www.dainikbangladeshkhobor.com : দৈনিক বাংলাদেশ খবর : দৈনিক বাংলাদেশ খবর
  2. info@www.dainikbangladeshkhobor.com : দৈনিক বাংলাদেশ খবর :
শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬, ০১:৫৬ পূর্বাহ্ন

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে রোগীর চাপ, জনবল সংকটে সেবা ব্যাহত

প্রতিনিধির নাম :
  • প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৭ বার পড়া হয়েছে
জেলা প্রতিনিধি,চাঁপাইনবাবগঞ্জ: দিন দিন হাম ও ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগী বাড়ছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে। প্রতিদিনই ভর্তি হচ্ছে রোগী। তবে তীব্র জনবল সংকটে সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালের প্রশাসনিক তথ্য অনুযায়ী, ২৫০ শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৭৫০ জন রোগী ভর্তি থাকে। এছাড়াও বহির্বিভাগে প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে আসেন প্রায় ১২০০ থেকে ১৫০০ রোগী।

একদিকে হাসপাতালে ডাক্তার, নার্স ও গুরুত্বপূর্ণ টেকনোলজিস্টসহ শতাধিক পদ শূন্য, অন্যদিকে হাসপাতালে হামের রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এমন নাজুক পরিস্থিতির মধ্যেই আসন্ন বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গু ও ডায়রিয়ার মতো পানিবাহিত রোগের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চরম উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে।

হাসপাতালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে আজ ৮ এপ্রিল পর্যন্ত সর্বমোট ৪৮৪ জন নতুন হাম রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ৩৮ জন রোগী (২০ জন ছেলে ও ১৮ জন মেয়ে) ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে হাসপাতালে মোট ৭৩ জন হাম রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন, যার মধ্যে ৩৮ জন ছেলে এবং ৩৫ জন মেয়ে। এর আগে ৬৫ জন রোগী ভর্তি ছিলেন, যাদের মধ্যে ২৭ জনকে সুস্থ হওয়ার পর ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে এবং ৩ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রেফার করা হয়েছে।

হামের পাশাপাশি হাসপাতালে ডায়রিয়া রোগীর চাপও বেড়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডায়রিয়া ওয়ার্ডে আগের ভর্তি থাকা ৬৯ জন রোগীর সাথে নতুন করে আরও ৪১ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। ৫৩ জন রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও বর্তমানে ৫৭ জন রোগী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

বুধবার (৮ এপ্রিল) সরজমিনে হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, বহির্বিভাগসহ সর্বত্র রোগীদের উপচে পড়া ভিড়। বেড না পেয়ে হাসপাতালটির মেঝে ও সিঁড়িতে শুয়ে বসে চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন রোগীরা। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে করিডোরগুলোতে পর্যাপ্ত ফ্যান না থাকার কারণে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন রোগী ও স্বজনেরা।

এদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হাসপাতালটি ২৫০ শয্যা বিশিষ্ঠ হলেও প্রায় ৭৫০ রোগী ভর্তি থাকে এবং বর্হিবিভাগে ১২০০ থেকে ১৫০০ রোগী চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করে। জনবল সংকটের মধ্যে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এই চাপ সামাল দিতেই হিমশিম খাচ্ছে। অন্যদিকে নতুন করে হামের প্রাদুর্ভাব এবং বর্ষা মৌসুমের ডেঙ্গু ও ডায়রিয়ার চাপ সামলাতে আরও হিমশিম খেতে হবে বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে, জনবল সংকটের এই নাজুক বিষয়টি নিয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন আকারে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে অবহিত করা হলেও এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি। বার বার তাগাদা দেওয়া সত্ত্বেও নিয়োগ বা পদায়নের অভাবে দীর্ঘস্থায়ী এই সংকট নিরসন হচ্ছে না। এমতাবস্থায় জেলার এই একমাত্র বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্রে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা করছে সচেতন মহল। দ্রুত শূন্য পদগুলোতে দক্ষ জনবল নিয়োগের মাধ্যমে রোগীদের ভোগান্তি লাঘব এবং আসন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার আলীনগরের বাসিন্দা হেলাল উদ্দিন ছবি বলেন, আমাদের মেডিকেলের যে অবস্থানটা দেখতে পাচ্ছি এখন পর্যন্ত আমি যে ট্রিটমেন্ট নিতে আসছি, একটা রোগীর থাকার মতো যে পরিবেশ নাই। অসুস্থতা নিয়ে মেডিকেলে ভর্তির পরে বসার মতো জায়গাটাও নাই। দিনের বেলায় ডাক্তার রাউন্ড দিয়ে যাওয়ার পরে আর কোনো ডাক্তার আমাদের খোঁজখবর নেয় না। এমনকি রাতে কোনো ইমারজেন্সি প্রবলেমে পড়লেও ডাক্তার নাই। তাই আমি সরকারের কাছে অনুরোধ করবো এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার যে সকল জনপ্রতিনিধি আছে তাদের কাছে আকুল আবেদন করছি- চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালের দিকে আপনারা নজর দিয়ে এই সংকটগুলো দূর করবেন।

সদর উপজেলা শিমুলতলার বাসিন্দা সারিউল ইসলাম বলেন, আজকে আমার বাচ্চাকে ডাক্তার দেখাতে আসছিলাম। এখানে এসে যতটুকু শুনলাম এখানে নার্স ও ডাক্তার সংকট আছে। আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি যেন এই সমস্যাগুলো সমাধান করা হয়।

সদর উপজেলার চরাঞ্চলের শাহাজাহানপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা মহব্বত আলী বলেন, আমি মূলত রোগী নিয়ে আছি গতকাল থেকেই। এখানে যে দুরাবস্থা সেটি হচ্ছে এখানে সাধারণ রোগী প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে এসে যে কষ্ট করছে, এই কষ্টের বিনিময়ে তারা কোনো চিকিৎসা সেবা তেমন পাচ্ছে না। এখানে ডাক্তার পাচ্ছে না, নার্স পাচ্ছে না। আমি মেডিসিন ও শিশু বিভাগে দেখলাম, কোনো ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত ডাক্তার ও নার্স নাই। ডাক্তারা একবার রাউন্ড দিচ্ছে, সেটিই শেষ। রোগীটির যে অবস্থা হচ্ছে সেটি তারা আর দেখে না। সেক্ষেত্রে আমরা দাবি জানাবো দ্রুত যেন পর্যপ্ত স্টাফ, নার্স ও ডাক্তার নিয়োগ দেওয়া হোক।

গোদাগাড়ি উপজেলার শামিম তার স্ত্রীকে নিয়ে এসেছিলেন গাইনি ডাক্তার দেখানোর জন্য। তিনি বলেন, হাসপাতালে টিকিট কেটে গাইনি ডাক্তার দেখাতে আসছি। কিন্তু হাসপাতালের সেই গাইনি ডাক্তার ছুটিতে আছে। এজন্য ডাক্তার না দেখিয়ে চলে যাচ্ছি। প্রায় ২০ কিলোমিটার দূর থেকে এসে ফেরত যেতে হচ্ছে। তাই সরকারের কাছে দাবি এখানে যেন পর্যাপ্ত ডাক্তার নিয়োগ দেয়।

সাংস্কৃতিক কর্মী ফিরোজ আহমেদ হিরক বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে একদিকে রোগীর উপচে পড়া ভিড়। এবং অন্যদিকে চিকিসৎক সংকট।  হাম রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। আগামীতে ডেঙ্গু, নিউমোনিয়াসহ আরও জটিল রোগের আশঙ্কা রয়েছে। সেক্ষেত্রে যে হারে চিকিসক সংকট চলছে এবং রোগীদেরকে রেফার্ড করছে বাইরে। চিকিসক সংকটটা দূর করে এবং অনান্য স্টাফদের অভাবটা দূর করে চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রাখা হোক।

২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালটির তত্ত্বাবধায়ক ডা. মুহাম্মদ মশিউর রহমান বলেন, আমাদের এটি ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল, কিন্তু আমাদের এখানে কখনোই ৬৫০ এর কম রোগী ভর্তি থাকে না। আবার কখনো কখনো এই রোগীর সংখ্যা ৭৫০ থেকে ৮০০ পর্যন্ত ছাড়িয়ে যায়। এখন আবার নতুন করে হামের প্রকোপ দেখা দিয়েছে। এটা ২৫০ শয্যা হাসপাতাল হলেও জনবল কিন্তু অর্ধেকেরও কম। আমাদের এখানে ডাক্তারের সংখ্যা অনেক কম এবং চতুর্থ শ্রেণির জনবলও কম আছে। একমাত্র নার্সিং স্টাফ এই মুহূর্তে পর্যাপ্ত আছে।

তিনি বলেন, সামনে বর্ষাকাল আসছে। গত বছর ডেঙ্গু রোগী প্রচুর ভর্তি ছিল। ফলে তখন এই জাতীয় রোগের প্রকোপ বেড়ে যাবে। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে ডাক্তারের যে শূন্য পদ এটা পূরণ করা বরং অ্যাটাচমেন্টে বেশ কিছু ডাক্তার দেওয়া। এটা একটি সদর হাসপাতাল। পুরো জেলার আশা আকাঙ্ক্ষার জায়গা হচ্ছে এই সদর হাসপাতাল। এখানে বেশ কিছু বিশেষজ্ঞ চিকিসকের অভাব আছে।

রোগী রেফার্ডের বিষয়ে ডা. মুহাম্মদ মশিউর রহমান বলেন, রেফার্ডের দুইটি অংশ আছে। আমাদের এখানে সকল ওয়ার্ড চালু নাই। আইসিইউ, সিসিইউ ও ডায়ালাইসিস নাই। ফলে এই জাতীয় রোগী যখনই আসে তখন আমরা মনে করি এই জাতীয় রোগী ক্রিটিক্যাল, তখনই রোগীর ভালোর কথা চিন্তা করে আমরা এখানে রাখি না।  দ্বিতীয় রোগীরাও চিন্ত করে তারা যদি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যায় তাহলে আরও বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের দেখা পাবে। তাই একটা অংশ সেইসব কারণে রাজশাহী মেডিকেলে ট্রান্সফার হয়ে যায়।

হাসপাতালে জনবল সংকট, শতাধিক পদ শূন্য 

চাঁপাইনবাবগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে বর্তমানে বিভিন্ন স্তরে গুরুত্বপূর্ণ পদসহ জনবল সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। হাসপাতালের প্রশাসনিক কার্যালয় থেকে প্রকাশিত এক হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, চিকিৎসা সেবা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনায় নিয়োজিত বিভিন্ন ক্যাটাগরির মোট ১০৬টি পদ বর্তমানে শূন্য রয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, হাসপাতালে অনুমোদিত মোট পদের বিপরীতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক চিকিৎসক, নার্স ও তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী কর্মরত নেই। শূন্য পদের তালিকায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ থেকে শুরু করে ল্যাব টেকনোলজিস্ট, অফিস সহকারী এবং চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীও রয়েছেন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের বিভিন্ন বিভাগসহ বিভিন্ন স্তরে এই দীর্ঘস্থায়ী জনবল সংকটের কারণে হাসপাতালের স্বাভাবিক চিকিৎসা কার্যক্রম ও দাপ্তরিক সেবাপ্রাপ্তিতে সাধারণ রোগীদের ভোগান্তির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে শূন্য পদের এই তালিকা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়েছে। জনস্বার্থে এবং রোগীদের উন্নত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জরুরি ভিত্তিতে এই শূন্য পদগুলোতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক দক্ষ জনবল নিয়োগ বা পদায়নের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন

পুরাতন সংবাদ পড়ুন

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।
ওয়েবসাইট ডিজাইন: ইয়োলো হোস্ট