
অনলাইন ডেস্ক:
নানা আলোচনায় শুরু হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। এদিন স্পিকারের শূন্য আসন নিয়ে অধিবেশন শুরু করা ছাড়াও ঘটেছে নানা ঘটনা। এর মধ্যে রয়েছে প্ল্যাকার্ড দেখিয়ে রাষ্ট্রপতির ভাষণের প্রতিবাদ এবং ভাষণ শুরুর পরপরই বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের ওয়াক আউটের মতো ঘটনা।
গণ-অভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের প্রায় ১৯ মাস পর যাত্রা শুরু করেছে নতুন সংসদ।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হওয়া নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এর পর জাতীয় সংসদের অধিবেশনের তারিখ ঠিক করা হয় ১২ মার্চ (বৃহস্পতিবার) দিনটিকে।
ব্যতিক্রম পরিস্থিতিতে সংসদ অধিবেশন শুরুর প্রক্রিয়া, স্পিকার নির্বাচন এবং রাষ্ট্রপতির ভাষণে থাকা বিভিন্ন বিষয়ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবারের সংসদ অধিবেশনে।
এদিন নিয়ম অনুযায়ী সংসদের প্রথম অধিবেশনে ভাষণ দিতে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে আহ্বান জানান নবনির্বাচিত স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
সে সময় সংসদে দাঁড়িয়ে প্ল্যাকার্ড হাতে বিক্ষোভ শুরু করেন জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের সংসদ সদস্যরা।
তাদের প্ল্যাকার্ডে বাংলা ও ইংরেজিতে লেখা ছিল—‘জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে গাদ্দারি জনগণ সইবে না’। সংসদের শৃঙ্খলা রক্ষায় স্পিকার বারবার আহ্বান জানালেও প্রতিবাদ চালিয়ে যান বিরোধী দলের এমপিরা।
তাদের প্রতিবাদের মধ্যেই নিজের ভাষণ চালিয়ে যান রাষ্ট্রপতি।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে নানা স্লোগান দিয়ে অধিবেশন কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা।
বিরোধীদলের ওয়াক আউটের মাঝেও রাষ্ট্রপতির বক্তব্য শুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে টেবিল চাপড়াতে দেখা যায়।
সাধারণত বিদায়ি সংসদের স্পিকার অথবা ডেপুটি স্পিকারের সভাপতিত্বে নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা থাকলেও এবার সেটি হয়নি। আগের সংসদের স্পিকারের পদত্যাগ এবং ডেপুটি স্পিকার কারাগারে থাকায় এদিন স্পিকারের আসন ফাঁকা রেখেই শুরু হয় সংসদ অধিবেশন। পরে একজন সভাপতির মাধ্যমে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হয়।
প্রথম অধিবেশন শুরুতে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান।
এদিন রাষ্ট্রপতি নিজের বক্তব্যে নবনির্বাচিত বিএনপি সরকারের পরিকল্পনা, জুলাই আন্দোলনে সাবেক সরকারের ভূমিকা, স্বাধীনতার ঘোষক, দুর্নীতিসহ নানা বিষয়ে বক্তব্য দেন।
তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ ফ্যাসিবাদি শাসনের অবসানের পর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে এই সংসদের যাত্রা শুরু হয়েছে।’
বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ উল্লেখ করে মুক্তিযুদ্ধসহ বাংলাদেশের সব গণতান্ত্রিক সংগ্রামে নিহত ও আহতদের স্মরণ করেন রাষ্ট্রপতি।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘দেশকে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন বানিয়ে ২০০১ সালে ক্ষমতা ছেড়েছিল আওয়ামী লীগ। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকার দুর্নীতি দমনে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে।’
তিনি বলেন, দুর্নীতি প্রতিরোধের লক্ষ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪ প্রণয়ন করা হয়। যার ফলে ‘বিশ্বে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কলঙ্ক থেকে মুক্তি পায় বাংলাদেশ।’
‘২০০৬ সালের অক্টোবর মাসে বিএনপি যখন রাষ্ট্র ক্ষমতা থেকে বিদায় নেয় তার অনেক আগেই বিশ্বে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়নের কলঙ্ক থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশ এশিয়ার ইমার্জিং টাইগার হিসেবে স্বীকৃতি পায়,’ বলেও উল্লেখ করেন রাষ্ট্রপতি।
গত সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার না থাকায় স্পিকারের আসনটি ফাঁকা রেখেই শুরু হয় অধিবেশন। পরে সংসদের সম্মতিতে প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন বিএনপির সংসদ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তার সভাপতিত্বে স্পিকার হিসেবে বিএনপি নেতা ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদকে স্পিকার এবং ডেপুটি স্পিকার হিসেবে নির্বাচন করা হয় ভূমি প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার কায়সার কামালকে। পরে সংসদের অধিবেশন ৩০ মিনিটের জন্য মুলতবি করা হয়।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমানের উপস্থিতিতে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে শপথ পড়ান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
বিরতির পর স্পিকার হিসেবে নিজের প্রথম অধিবেশনের বক্তব্যে মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র হবে জাতীয় সংসদ।’
এ সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পিকারকে বলেন, ‘আজ থেকে আপনারা আর কোনো দলের নয়। আপনারা এই সংসদের স্পিকার।’
বিরোধীদলীয় প্রধান বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান তার বক্তব্যে স্পিকারকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আপনি ইতিমধ্যে বিএনপি থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। এখন আপনি সবার। আমরা মনে করি, আপনার কাছে সরকারি দল ও বিরোধী দল আলাদা কিছু হবে না।’
তবে বিরোধী দলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের এর আগে সংসদে দাঁড়িয়ে বলেন, স্পিকার নির্বাচনের বিষয়ে আগে থেকে তাদের সঙ্গে আলোচনা হয়নি। ভবিষ্যতে যেসব বিষয়ে আলোচনা সম্ভব সেসব বিষয়ে যেন তাদের সঙ্গে আলাপ করা হয় এটা তারা আশা করবেন।
এদিন সংসদে শোক প্রস্তাবের ওপর সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং জুলাই অভ্যুত্থানে নিহতদের নিয়ে আলোচনা হয়।
এ ছাড়া ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের প্রধান ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিস জর্জ মারিও বার্গোগ্লিও এবং ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুতে সংসদে শোক ও দুঃখ প্রকাশ করা হয়। সাবেক বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্যের মৃত্যুতেও শোক প্রস্তাবে তাদের নাম উল্লেখ করা হয়।
জুলাই অভ্যুত্থানে নিহতদের নিয়ে আলোচনার সময় সংসদের শোক প্রস্তাবে ওসমান হাদি, আবরার ফাহাদ ও ফেলানি খাতুনের নাম অন্তর্ভুক্ত করার আবেদন জানান সংসদের বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ কেউ যেন সংসদে বক্তব্য দিতে না পারে, সেই আহ্বানও জানান তিনি।
এ ছাড়া প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনেই অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন করেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।