
মোঃ মাসুদ রানা, কুমিল্লা জেলা প্রতিনিধি: জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থীদের প্রাথমিক তালিকা ঘোষণার প্রায় ৭ সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও কুমিল্লার ৪টি সংসদীয় আসনে দলীয় বিরোধ মীমাংসায় উদ্যোগ নেয়নি দলের হাইকমান্ড। প্রার্থীদের নাম ঘোষণার আগে রাজধানীতে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠকে সম্ভাব্য প্রার্থীরা দলের মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার অঙ্গীকার করেন। তবে প্রার্থী তালিকা
ঘোষণার পর জেলার ৪ আসনে এখনও বিরোধ নিষ্পত্তি হয়নি।
মনোনয়নপ্রত্যাশীরা বলছেন, তারেক রহমান দেশে ফেরার পর ঘোষিত প্রাথমিক তালিকা ‘পরিবর্তন’ হতে পারে। এমন আশায় অনেকেই কেন্দ্রে দৌড়ঝাঁপ করে যাচ্ছেন। মনোনয়নপ্রত্যাশীদের কেউ কেউ কিনেছেন মনোনয়ন ফরম। ভোটের মাঠে আধিপত্য বিস্তারসহ চালাচ্ছেন কৌশলী প্রচার। এতে দোটানায় পড়েছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। দলে দেখা দিয়েছে বিভক্তি।দলীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ৩ নভেম্বর বিএনপি কুমিল্লার ১১টি সংসদীয় আসনের মধ্যে চান্দিনা ও হোমনা বাদে ৯টিতে প্রাথমিক প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করে। এতে কুমিল্লা-৫ (বুড়িচং ও ব্রাহ্মণপাড়া), কুমিল্লা-৬ (সদর ও সদর দক্ষিণ), কুমিল্লা-২ (হোমনা ও তিতাস) এবং কুমিল্লা-১০ (নাঙ্গলকোট ও লালমাই) আসনের দলীয় প্রার্থীদের সঙ্গে মনোনয়নবঞ্চিত নেতাকর্মীদের বিরোধ দেখা দেয়। বিভিন্ন কর্মসূচির নামে সরব হন মনোনয়নবঞ্চিতরা। কুমিল্লা-৭ (চান্দিনা) আসনে এখনও প্রার্থী ঘোষণা করেনি বিএনপি। আসনটি শরিক দল এলডিপির মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহমেদের জন্য ছেড়ে দেওয়া হতে পারে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
কুমিল্লা-২ আসন
এই আসনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়া অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে একাট্টা হয়ে মাঠে আছেন মনোনয়নপ্রত্যাশী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সাবেক এপিএস ইঞ্জিনিয়ার এম এ মতিন খান, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মাহফুজুল ইসলাম, হোমনা উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান মোল্লা এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাবেক নেতা ওমর ফারুক মুন্না। গত ৯ ডিসেম্বর তারা সংবাদ সম্মেলন করে প্রার্থী পরিবর্তনের দাবি জানান। মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন ইঞ্জিনিয়ার এম এ মতিন ও অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান মোল্লা। আজিজুর রহমান মোল্লা সমকালকে বলেন, ‘আমরা এখনও প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে আন্দোলন করে যাচ্ছি। মনোনয়ন ফরমও কিনেছি। দলের হাইকমান্ডের দিকে চেয়ে আছি। পরিস্থিতি বুঝে আমরা সিদ্ধান্ত জানাব।’ কুমিল্লা-৫ আসন
এখানে মনোনয়ন পেয়েছেন দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব জসিম উদ্দিন। তবে মনোনয়নের দাবিতে মহাসড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন বুড়িচং উপজেলা বিএনপির সভাপতি মিজানুর রহমানের সমর্থকরা। মিজানুর রহমান বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে দলের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। দলীয় মনোনয়নে দুইবার উপজেলা চেয়ারম্যান ছিলেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী। দল প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ করেছে, এটি তো চূড়ান্ত নয়। মনোনয়ন ফরম কিনেছেন। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছেন তিনি। তবে দলীয় প্রার্থী জসিম উদ্দিন বলেন, ‘দুই উপজেলার নেতাকর্মীদের নিয়ে মাঠে কাজ করছি। প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার পর আশা করি সবাই ধানের শীষের পক্ষে কাজ করবে।’
কুমিল্লা-৬ আসন
এই আসনে দলের মনোনয়ন পেয়েছেন চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মনিরুল হক চৌধুরী। এতে দলের চেয়ারপারসনের আরেক উপদেষ্টা হাজী আমিন উর রশিদ ইয়াছিনের অনুসারীরা মনোনয়ন দাবিতে সড়ক অবরোধ, মশাল মিছিল ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেন। নগরীতে মনিরুল হক চৌধুরী ও হাজী ইয়াছিনের অনুসারীরা পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির নামে উত্তাপ ছাড়ান। মনোনয়ন ঘিরে দলের নেতাকর্মীরাও বিভক্ত হয়ে পড়ছেন। দলের প্রার্থী মনিরুল হক চৌধুরীর জন্য মাঠে প্রচার চালাচ্ছেন কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মনিরুল হক সাক্কু। গত সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে সাক্কু বলেছেন, ‘আমি দল থেকে বহিষ্কৃত হলেও দলের প্রার্থীর জন্য কাজ করছি। তবে হাজী ইয়াছিন মনোনয়ন পেলে আমি স্বতন্ত্র প্রতীকে নির্বাচন করব।’ হাজী ইয়াছিন সমকালকে জানান, দীর্ঘ ১৬-১৭ বছর নেতাকর্মীদের নিয়ে মাঠে আন্দোলন সংগ্রাম করেছেন তিনি। অনেক বয়স হয়েছে। নেতাকর্মীদের রেখে এখন কোথায় যাবেন? তাঁর আশা, দল শেষ সময়ে এসে তাঁকে মূল্যায়ন করবে। মনিরুল হক চৌধুরী বলেন, দলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত, দল তাঁকে মনোনয়ন দিয়েছে। দলের নেতাকর্মীরা তাঁর সঙ্গে আছেন, যারা বাইরে আছেন, তারাও সময়মতো ধানের শীষের পক্ষে চলে আসবেন।
কুমিল্লা-১০ আসন
এখানে মনোনয়ন পেয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য আবদুল গফুর ভুঁইয়া। তবে মনোনয়ন দাবিতে অবরোধ কর্মসূচি পালন করছেন দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মোবাশ্বের আলম ভুঁইয়া। এ আসনে মনোনয়ন ফরম কিনেছেন বিএনপি নেত্রী সোহানা সুলতানা শিউলি। মোবাশ্বের আলম ভুঁইয়া বলেন, নেতাকর্মীরা প্রার্থী পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে আসছেন, দলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছেন।
বুধবার বিএনপির কুমিল্লা বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাক মিয়ার সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। দৈনিক বাংলাবাজার তিনি বলেন, কুমিল্লার ১১টি আসনের মধ্যে ১০টি আসনে দলের প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করা হয়েছে। তবে কোনো আসনে প্রার্থী তালিকা পরিবর্তনের কোনো খবর তাঁর জানা নেই। প্রার্থীদের বাইরেও কেউ কেউ মনোনয়ন ফরম কিনেছেন। কেন্দ্র থেকে মনোনয়ন তালিকা দেওয়ার পর আর কোনো বিরোধ থাকবে না বলে আশা তাঁর। দলের হাইকমান্ডের নির্দেশে সবাই ধানের শীষের পক্ষে চলে আসবে।